দিদি ভাই Story 14 in Bengali
কলকাতার এক পুরোনো পাড়ার এক তলার ফ্ল্যাটে তখন ভ্যাপসা গরম। জানলার শার্সিগুলো খুলে দেওয়া, কিন্তু তাতে বাতাসের আনাগোনা প্রায় নেই বললেই চলে। এই গুমোট দুপুরে, রোদ এসে পড়েছে ঠিক নীলার কপালে। ছোটবেলা থেকে এই ঘর, এই আসবাব, সবকিছুই তার ভীষণ চেনা। কিন্তু আজ যেন সবকিছুই নতুন লাগছে। এই নতুনত্বের কারণ, আজই প্রথমবার তার ঘরে এসেছে রোহান। রোহান, তার থেকে দশ বছরের ছোট। দিদি ভাই বলে ডাকে, কিন্তু এই ডাকের আড়ালে যে অন্য এক অনুভূতি লুকিয়ে আছে, তা দুজনেই আজ টের পাচ্ছে।
নীলার বয়স তেত্রিশ। জীবনটা থমকে আছে অনেকখানি। স্বামী বছর তিনেক আগে দুর্ঘটনায় মারা গেছে। তারপর থেকে এই একলা জীবন, এই ঘর, এই স্মৃতি। একমাত্র ভাসুরপো রোহান, ছোটবেলা থেকে তাকে দিদি বলে ডাকলেও, আজ সে আর সেই ছোট্ট ছেলেটি নেই। কুড়ি বছর বয়সী রোহান আজ এক পরিণত যুবক। তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত আকর্ষণ, যা নীলাকে বারে বারে অস্থির করে তোলে। আজ সে এসেছে কিছু বই ফেরত দিতে, কিন্তু তার আসার কারণটা যে নিছক বই দেওয়া-নেওয়া নয়, তা নীলার চেয়ে ভালো আর কে জানে!
রোহান ঘরে ঢুকেই নীলার দিকে তাকালো। নীলা আজও সেই শাড়িতে। হালকা নীল রঙের শাড়ি, তাতে সাদা ছোট ছোট ফুল। চুলগুলো এলোমেলো, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। রোহানের চোখ আটকে গেল নীলার হাতের দিকে। নেলপালিশ নেই, কিন্তু নখগুলো সুন্দর। হাতের রেখাগুলো যেন তার নিজের জীবনের গল্প বলছে। নীলা একটু সরে দাঁড়ালো, "এসো রোহান, ভেতরে এসো। গরম লাগছে খুব, তাই না?"
রোহান নীলার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, "হ্যাঁ দিদি, খুব গরম। কিন্তু আপনার ঘরে এলে সবসময়ই একটা শান্তি লাগে।" তার গলার স্বরটা কেমন যেন একটু ভারী শোনালো। নীলার বুকের ভেতরটা ধুক করে উঠলো। এই প্রথম রোহানের গলার স্বরে এমন কিছু সে শুনলো, যা তাকে অন্যরকমভাবে ছুঁয়ে গেল।
রোহান বইগুলো নীলার হাতে দিয়ে বললো, "আপনার এই বইগুলো খুব ভালো লাগলো দিদি।" নীলা হাসার চেষ্টা করলো। "তোমার ভালো লেগেছে জেনে আমারও ভালো লাগলো। আরো কিছু বই লাগবে?"
রোহান মাথা নাড়লো। "আজ আর বইয়ের জন্য আসিনি দিদি।" তার চোখ নীলার মুখের উপর স্থির। নীলার ঠোঁট দুটো একটু কাঁপছে। সে জানে, আর সে নিজেকে আটকাতে পারবে না। এই দীর্ঘদিনের চাপা অনুভূতি, এই নীরব আকর্ষণ, আজ হয়তো সব বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে।
রোহান ধীরে ধীরে নীলার দিকে এগিয়ে এলো। ওর চোখে মুগ্ধতা, একটু দ্বিধা, আর অনেকখানি ভালোবাসা। নীলাও যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। রোহান নীলার মুখের সামনে এসে দাঁড়ালো। ওর নিঃশ্বাস নীলার গালে লাগছে। নীলার মনে হলো, এই মুহূর্তে সময় যেন থমকে গেছে। দু'জনের চোখের ভাষায় যা বলা হচ্ছে, তা কোনোদিন কোনো শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
রোহান নীলার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে তুলে নিল। নীলার হাতটা কাঁপছে। রোহানের স্পর্শ যেন এক বিদ্যুৎপ্রবাহ। নীলা চোখ বন্ধ করে ফেললো। ও জানে, এই মুহূর্তের জন্য ও কতটা অপেক্ষা করেছে। রোহানের আঙুলগুলো নীলার আঙুলের মধ্যে আস্তে আস্তে জড়িয়ে ধরলো। নীলার মনে হলো, সে যেন এক স্বপ্নপুরীতে হারিয়ে গেছে।
রোহান নীলার আরও কাছে সরে এলো। ওর কপালে এসে লাগলো নীলার কপাল। নীলার মনে হলো, এই প্রথম সে কারো উষ্ণতা এত কাছ থেকে অনুভব করছে। রোহানের ঠোঁট নীলার ঠোঁটের উপর আলতো করে স্পর্শ করলো। প্রথম স্পর্শে ছিল দ্বিধা, ছিল বিস্ময়। তারপর ধীরে ধীরে সেই স্পর্শ গাঢ় হলো। নীলার শরীর জুড়ে যেন এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল। সে রোহানের বাহুতে নিজেকে সঁপে দিল।
তাদের ঠোঁট একে অপরের মধ্যে বিলীন হয়ে গেল। সেখানে ছিল না কোনো দ্বিধা, ছিল না কোনো বাধা। ছিল শুধু দু'টো হৃদয়ের আকুলতা, দু'টো দেহের এক হয়ে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। নীলার মনে হলো, এই প্রথম সে জীবনের আসল মানে খুঁজে পেল। রোহানের আলিঙ্গনে সে খুঁজে পেল সেই আশ্রয়, যা সে এতকাল ধরে খুঁজছিল। তাদের এই নীরব ভাষা, এই গভীর অনুভূতির প্রকাশ, তা ছিল এক অপার্থিব প্রেমগাথা।
ঘরের বাইরে তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলেছে। কিন্তু এই ছোট্ট ঘরে, দু'টো হৃদয়ে তখন এক নতুন ভোরের সূচনা হয়েছে। দিদি ভাই সম্পর্কটা আজ এক নতুন মোড় নিল, যেখানে শুধু ভালোবাসা আর তীব্র কামনা। এই বন্ধন ছিল শুধু শরীরের নয়, ছিল দু'টো আত্মার এক হয়ে যাওয়ার। নীলার জীবনের শূন্যতা রোহানের আগমনে আজ পূর্ণতা পেল। আর রোহান, তার দিদি ভাইয়ের মধ্যে খুঁজে পেল তার প্রথম প্রেম, তার জীবনের সবটুকু ভালোবাসা।